বইটি আহামদ ছফার অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে চলার পথে বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে রচিত। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে যারা বিদ্বান তাদের সাথে চললে অনেক কিছু জানা যায়, যা বাস্তব জীবনে কাজে দেয়। ১৯৭০ সাল, আহমদ ছফা ঠিক করলেন পিএইচডি করবেন। পেয়ে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপ। এখন দরকার একজন অফিসিয়াল থিসিস সুপারভাইজার।
বন্ধুদের পরামর্শে তিনি যোগাযোগ করেন জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সাথে এবং সেই থেকে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক শুরু। তারপর একে একে কেটে যায় দীর্ঘ দুই দশক।
এই দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সুবাদে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও দর্শন লেখক আহমদ ছফা তুলে ধরেছেন এই বইতে।প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক দেশের জাতীয় অধ্যাপকের একজন। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ডিলিট উপাধি প্রদান করা হয়। দাম্পত্য জীবনে চিরকুমার। বাংলা সাহিত্যের সাথে জড়িত অনেক প্রবাদ পুরুষের সাথে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আছে অনেক মজার ঘটনা।
কথা বার্তা ও খাবার-দাবার এ তিনি ঢাকার ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে ছিলেন। তাঁর মুখ হতে উচ্চারিত ঢাকাইয়া বুলি অনেক আধুনিক মনে হত।তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ, জ্ঞানের সেবা। নিজে যেমন জ্ঞান অর্জন করতেন তেমনি অন্যকেও অনুপ্রেরণা দিতেন জ্ঞান সাধনায় ব্রত হওয়ার প্রতি।আহমদ ছফার মতে, ‘প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের মত আমাকে অন্য কোনো জীবিত বা মৃত মানুষ এত প্রভাবিত করতে পারেনি’। রাজ্জাক সাহেব তাকে প্রচুর বই পড়তে বলতেন। নোট রাখতে বলতেন। প্রয়োজনে ধমক দিতেন।জার্মান কবি গ্যোতের ‘ফাউস্ট’ এর অনুবাদ করাকে নিজের একটা বড় কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আহমদ ছফা। একই সাথে এই কাজের প্রধান অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে নাম নিয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক স্যারের।
জ্ঞানের সেবা করতেই রাজ্জাক সাহেব চিরকুমার থেকে গেছেন। তাঁর বিশাল লাইব্রেরির পুরাতন বইয়ের সুমিষ্ট সুবাস আহমদ ছফাকে আকৃষ্ট করতো। সেখানে ছিল দেশি বিদেশি নানা বই। রাজনীতি, অর্থনীতি, পৌরনীতি, সাহিত্য, ডিকশনারি সব রকমের বই।বইটিতে প্রফেসর সাহেবের ধর্মীয় গবেষণার কিছু দিকও প্রকাশ পেয়েছে। জন্মান্তরবাদ এর ছিটেফোঁটাও বেদে নেই। এটা হিন্দু সমাজ দ্রাবিড়দের কাছ থেকে ধার করে একটা প্রথা হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছে।বাইবেল মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে অনেক কথা বললেও ইসলামের মত পার্থিব জীবন নিয়ে তেমন কিছু বলেনি।যেখানে ‘ইসলাম ফিদ্দুনিয়া ওয়াল আখেরাত’ এর কথা বলে দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে একটা ভারসাম্যমূলক বক্তব্য দিয়েছে।এই বইটিতে কাজী মোতাহের হোসেন, শেখ মুজিব প্রমুখ ব্যক্তিদের নিয়ে কথা হয়েছে গুরু শিষ্যের মধ্যে।পাঠকদের পরিচয় করে দেয়া হয়েছে অনেক বইয়ের সাথে।শেষ করব, ‘যদ্যপি আমার গুরু’র দুটো লাইন দিয়ে, “আমি বললাম, বাংলার ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু বলেন। স্যার বললেন, বাংলার ভবিষ্যত সম্পর্কে আমি আর কি কমু। সে তো আপনাগো উপর।”