বই রিভিউ: হাজার বছর ধরে।

হাজার বছর ধরে উপন্যাস গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন এর সাথে মিলে যায় যেটা পড়লে মনে হয় যে আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো উপন্যাসের সঙ্গে মিলে যায়। আমি উপন্যাসটা প্রথম পড়েছিলাম ক্লাস সেভেনে, অনেক আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলাম। হাজার বছর ধরে উপন্যাস পড়ে আমার উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ জাগে।

মকবুলের ছোট বউ টুনি উপন্যাসে বোধকরি সবচে’ সক্রিয় নারীচরিত্র। তাকে ঘিরে উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয় বলা যায়। টুনি বয়সে কিশোরী। বয়সের সাথে মানানসই চপলচিত্ত তাকে মন্তুর সাথে গভীর রাতে শেখদের পুকুরে মাছ ধরতে কিংবা ধলপহরে পরীর দিঘিতে শাপলা তুলতে যেতে প্ররোচিত করে। প্ররোচিত করে নিজের বাপের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া মন্তুকে শেষ রাতে ঘুম থেকে তুলে কলসি নিয়ে খেজুরের রস চুরি করতে যাওয়ার সাহস দেখাতে। আত্মত্যাগে কলসির ব্যবহার প্রসঙ্গটা এখানেই আসে। টুনি মজার ছলে মন্তুকে একথা বললেও বুদ্ধিমান পাঠক এই মনস্তত্ত্বটা বুঝবেন বলেই মনে করি।

বঙ্কিম-সাহিত্যেও এ মনস্তত্ত্বের দেখা মেলে। প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন আমল থেকেই এই চর্চা ছিল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, পুরনো বাঙলা লোকগানেও এর প্রমাণ মেলে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক বাঙলা ভাষায় এ রূপকল্পের প্রয়োগ বেশি হয়।
উপন্যাসে অঙ্কিত গ্রামের মানুষগুলোর সকলের ধর্ম ইসলাম। সকলেই ধর্মকর্মে অতটা উৎসাহী না হলেও জীবনাচরণের দিক থেকে ধর্ম মেনে চলতেই তাদের দেখা যায়। তাবিজ-কবচ, জিন-ভূতে এন্তার বিশ্বাস তাদের। বিশ্বাস অবৈজ্ঞানিক ঝাড়ফুঁকেও। সকল ধর্মেই নারী-পুরুষে নিষিদ্ধতার বিষয়টা আছে। এটা এরা খুব মেনে চলে। ধর্মঘেঁষা কুসংস্কারও এদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ওলাবিবি প্রসঙ্গে ভয়-সমীহের মিশেলের কুসংস্কার তো রয়েছেই।
উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ, ঘটনাস্থল, বিস্তার, ভাষাতত্ত্ব বিবেচনায় শুধু সামাজিক উপন্যাস বলে দেয়া যায় না। এখানে মোটাদাগে ত্রিভূজ প্রেম দেখানো হয়েছে। হীরনের বিয়ের জটলায় ঘটনার আকস্মিকতায় সামাজিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে ত্রিভুজ প্রেমের গল্পও বেরিয়ে আসে, যেখানে টুনি মন্তুকে পেতে চায়, আবার আম্বিয়া মন্তুর ঘরের দরজা দিয়ে মন্তুর প্রতি টানের অপ্রকাশ্য প্রকাশ ঘটায়। একটা ঠাট্টার প্রতিক্রিয়ায় টুনি মারতে আসে সালেহাকে। আবার মন্তুর নির্বিকার চরিত্রের মধ্যে রহস্য খুঁজতে গেলে এখানে মনস্তাত্ত্বিক গল্পের আভাস মেলে।



Leave a Comment