স্পটলাইট ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটিতে ফুটে উঠেছে গোপন কিছু রহস্য বেদ করে সত্য উদঘাটন করেছে একটি সাংবাদিক টিম তার নাম স্পটলাইট। যাজকদের নির্যাতনের শিকার শিশুদের করুন কাহিনী তো ফুটে উঠেছে মুভিটিতে। মুভিটিতে প্রথমে যে দৃশ্যটা দেখানো হয়েছে অনেক কিছু বুঝায়। কাহিনীর পরীক্রমায় হয়ে গিয়ে যায় মুভিটি….
চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন টম ম্যাকার্থি। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন মার্ক রাফালো, মাইকেল কিটন, র্যাচেল ম্যাকঅ্যাডাম্স, লিভ স্ক্রাইবার, প্রমূখ। ৮৮তম একাডেমি পুরস্কার আসরের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র স্পটলাইট ।
যুক্তরাষ্ট্রে বোস্টনের ম্যাসাচুয়েটসে শিশুদের ওপর গির্জার ক্যাথলিক পুরোহিতের নির্যাতনের ঘটনা অনুসন্ধান করে দ্য বোস্টন গ্লোব পত্রিকার প্রতিবেদকরা। তাদেরকে বলা হয় স্পটলাইট টিম। ২০০৩ সালে নিজেদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিৎজার পুরস্কার জেতেন তারা। সেই সত্যি ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘স্পটলাইট’।
প্রতিটা দেশ, সমাজেই কিছু স্পর্শকাতর বিষয় থাকে, প্রদীপের নিচে অন্ধকার থাকে যা কেউই সামনে নিয়ে আসতে চান না। সাহস করে কেউ এগিয়ে এসে ভদ্রতা এবং সভ্যতার চাঁদর ওঠালেই নিচে দেখা যায় পচনের মাত্রা, কোন পর্যন্ত তা পৌছে গেছে তা ভেবে অবাক হতে হয়।
২০০২ সালে বিখ্যাত মার্কিন পত্রিকা বোস্টন গ্লোব পত্রিকায় নতুন সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেই সাংবাদিক মার্টি ব্যারন একটি পুরনো কলাম খুঁজে পান, যেখানে একজন আইনজীবির বরাত দিয়ে চার্চের একজন যাজকের ওপর শিশু নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়। তার অনুরোধে পত্রিকাটির বিখ্যাত ইনভেস্টিগেটিভ টিম ‘স্পটলাইট’ কাজ শুরু করে ক্যাথলিক চার্চের কিছু যাজকদের যৌন নিপীড়ন নিয়ে, যার ভিকটিমদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল শিশু (ছেলে এবং মেয়ে)। সাংবাদিকেরা তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য; একজন যাজক সম্পর্কে জানতে গিয়ে বেরিয়ে আসে ১৩ জন যাজকের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা, এবং ঘটনাপ্রবাহের আলোকে এবং নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক দল এবং ঐ আইনজীবির প্রচেষ্টায় বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ চিত্র, পুরো চার্চ ব্যবস্থাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রেই শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের চিত্র খুঁজে পান তারা।
২০০৩ সালে এ ধরনের প্রায় ৬০০টি ঘটনার রিপোর্ট আসার পর একপর্যায়ে বোস্টনের ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনাল স্বয়ং পদত্যাগ করেন, অসংখ্য শিশু রক্ষা পায় শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের হাত থেকে। ২০১৫ সালের অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতা মুভি ‘স্পটলাইট’ জীবন্তভাবে তুলে এনেছে সত্যিকার এই ঘটনাটিকে, তারকা সম্বলিত এনসেম্বল কাস্টের অসাধারণ অভিনয় এবং রুদ্ধশ্বাস ঘটনাপ্রবাহের আলোকে আপনি নিজেকেও স্পটলাইট টিমের একজন সদস্য ভাবতে পারেন। কোন ধরনের অ্যাকশন ছাড়া স্রেফ কাহিনী এবং সংলাপনির্ভর এই মুভিটি পুরো রানটাইমের ২ ঘন্টা ৬ মিনিট সময় আপনাকে টেনে ধরে রাখবে।
সিনেমায় যে ইস্যুটির উপর ফোকাস করা হয়েছে তা খুবই সেনসেটিভ ইস্যু, এ কারণেই খুবই সতর্কভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন স্পটলাইট টিম, এবং এখানে মুভির পরিচালক টম ম্যাকার্থি। একে তো শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, তার সাথে আছে অবাক করা সংখ্যক ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের নাম। স্পটলাইট টিম একপজন ইনসাইডারের কাছ থেকে কিছু গোপন তথ্য লাভ করেন, যা বলছে যে সমগ্র বিশ্বের চার্চের যাজকদের মধ্যে অন্তত ৬% সদস্য এইধরণের অপরাধের সাথে জড়িত। এর সাথে সাংবাদিক এবং আইনিজীবির মানবিক দিকগুলো, এইধরনের ঘটনা এবং ভিকটিমদের সাথে কথা বলবার বিষয়টিকে টম ম্যাককার্থি জীবন্তভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
মুভিটিতে যে বিষয়টি আমাকে আলোড়িত করে, তা হলো সত্যিকারের অনুসন্ধিৎসা এবং সমাজের ক্ষত সারানোর জন্য কিভাবে কার্যকর ভূমিকা নিতে হয়, তা তুলে আনবার এক অনবদ্য প্রচেষ্টা। শিশু নির্যাতনের কিছু অভিযোগ একেবারে ষাটের দশক থেকে গুঞ্জণে সীমাবদ্ধ ছিল, আর বছরের পর বছর সব জেনেও ক্যাথলিক চার্চ ব্যাপারটাকে কৌশলে ধামাচাপা দিয়ে গিয়েছে। পুরো সিস্টেমের বিরুদ্ধেই দাঁড়ানোর মত সাহস এবং কৌশল যেভাবে সাংবাদিকেরা নিয়েছিলেন, তা সত্যিই অসাধারণ। আর এই সামগ্রিক কাজের জন্যেই ২০০৩ সালে বোস্টন গ্লোব পত্রিকার এই স্পটলাইট দল পুলিৎজার পুরষ্কার লাভ করেছিলেন।