শ্রীলংকার অর্থনৈতিক দুর্দশা।

একসময় শ্রীলংকা ছিলো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে সামাজিক সূচকে সেরা। শিক্ষায়  সবার উপরে ছিলো শ্রীলংকা। পোশাক খাত দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ঢুকেছিল শ্রীলঙ্কাতেই। পর্যটকদের পছন্দের জায়গা ছিল শ্রীলংকা। গৃহযুদ্ধ শ্রীলঙ্কাকে আর এগোতে দেই নি। নিরাপত্তার অভাবে পোশাকশিল্প আশির দশকের চলে আসে বাংলাদেশ। শ্রীলংকার অর্থনৈতিক অবস্থা এখন মরণদশায়। সরকারের রায় নেই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না পণ্য। বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ। ২০০৬ সালে গৃহযুদ্ধ থামার পর ২০১২ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঠিকঠাক ছিল। মাথাপিছু আয় ছিল ৩ হাজার ৮১৯ ডলার। ২০১৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক দেশে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু কোন কিছু দরকার তা পারেনি। প্রবৃদ্ধি কমতে থাকলে বিশ্ব ব্যাংক তাদের নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে নামিয়ে দেয়।  রপ্তানি কমে যায় চলতি আয়া দেখা দেয় ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা।  শ্রীলংকার রপ্তানি পণ্য মূলত তিনটি,  পোশাক, চা, রাবার।  তিন পণ্য রপ্তানি কমে ছিলো মূলত ধস নামে  মহামারীর সময়
। অবশেষে ইউক্রেনের রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে আরো বিপদে পড়ে তারা। শ্রীলংকার আজকের পতনের জন্য  মূলত 2019 সালের দুইটি গটনা কে দায়ী করা হয়।  ওই বছর কলোম্বোই তিনটি হোটেল ও ইউটিউব হয়ে যায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটল মৃত্যু হয় ২৫৩ জনের।  এর পর পর্যটনে ধস নামে।  জিডিবিতে পর্যটন খাতের অবধারণ ১০ শতাংশ।   দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটায় প্রেসিডেন্ট নিজেই ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে নামিয়ে আনে ৮ শতাংশতে।   বলা হয়, চীনের ঋণের ফাঁদে বনন্দী শ্রীলংকা।  শ্রীলংকার ঋণের হার এখন জিডিপির 119 শতাংশ।  এবছর শ্রীলঙ্কাকে ঋণের 500 কোটি ডলার পরিশোধ করার কথা অথচ শ্রীলংকার হাতে আছে মাত্র 232 কোটি ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ।  সতরাং ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা দৈনন্দিন কাজ চালাতে  নতুন করে আরো ঋণের নিতে হচ্ছে।

বই রিভিউঃ বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী।


বন্ধু-বান্ধব,সহধর্মিনী ও সহকর্মীদের একরকম চাপাচাপিতেই বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে লেখা শুরু করেন তার আত্মজীবনী মূলক এই বই ” অসমাপ্ত আত্মজীবনী”। বইটি অসমাপ্ত বলার কারণ, তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা পেক্ষাপট, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেন নি। বঙ্গবন্ধুর লেখা ৪ টি খাতা আকস্মিকভাবে তার কন্যা শেখ হাসিনার হাতে হস্তগত হয়। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনার সহায়তায় বইটি ২০১২ সালের জুন মাসে প্রথম সংকলিত করে প্রকাশ করা হয় বাংলা ,আরবি ও হিন্দি সহ একাধিক ভাষায়।
বইটিয়ে আত্মজীবনী লেখার পেক্ষাপট, লেখকের বংশ পরিচয়, জন্ম, শৈশব, স্কুল ও কলেজের শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্ম কান্ড, দুর্ভিক্ষ, বিহার ও কলকাতার দাঙ্গা, ভারত ও পাকিস্থান ভাগ ( হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার কারণে) বঙ্গবন্ধু এখানে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। কলকাতাকেন্দ্রিক প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি,দেশ বিভাদের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫৪ সাল অবধি পুর্ব বাংলার রাজনীতি, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা অান্দোলন ( এসময় বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন),ছাত্রলীগ ও আওমীলিগ প্রতিষ্ঠা( এক্ষেত্রে অতি সাধারণ কর্মী সিহেবে কাজ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু কিন্তু সোহরাওয়র্দী সাব, যাকে তিনি রাজনৈতিক মডেল হিসেবে দেখতেন সে তাকে খুব প্রাধান্য দিত। যার ফলাফল বঙ্গবন্ধুর মহানেতা হয়ে উঠা) যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজীর দাঙ্গা, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণ এবং এসব বিষয়ে লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে।আছে লেখকের কারাজীবন, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সর্বোপরি সর্বংসহা সহধর্মিণী বেগম ফজিলাত্তুনেসা কথা, যিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সকল দুঃসময়ে অবিচল পাশে ছিলেন। একইসঙ্গে রাজনৈতিক কারণে লেখকের চীন, ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণের বর্ণনাও বইটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
বিশেষ কিছু উক্তি ঃ
১) “এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান যারা আছে আমাদের ভাই, বাঙালি-অবাঙালি—তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।”

২) “সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।”

৩) “রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।”

৪) “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”

বই রিভিউ : যদ্যপি আমার গুরু।

বইটি আহামদ ছফার  অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে চলার পথে বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে রচিত। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে যারা বিদ্বান তাদের সাথে চললে অনেক কিছু জানা যায়, যা বাস্তব জীবনে কাজে দেয়।  ১৯৭০ সাল, আহমদ ছফা ঠিক করলেন পিএইচডি করবেন। পেয়ে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপ। এখন দরকার একজন অফিসিয়াল থিসিস সুপারভাইজার।
বন্ধুদের পরামর্শে তিনি যোগাযোগ করেন জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সাথে এবং সেই থেকে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক শুরু। তারপর একে একে কেটে যায় দীর্ঘ দুই দশক।
এই দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সুবাদে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও দর্শন লেখক আহমদ ছফা তুলে ধরেছেন এই বইতে।প্রফেসর আবদুর  রাজ্জাক দেশের জাতীয় অধ্যাপকের একজন। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ডিলিট উপাধি প্রদান করা হয়। দাম্পত্য জীবনে চিরকুমার। বাংলা সাহিত্যের সাথে জড়িত অনেক প্রবাদ পুরুষের সাথে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আছে অনেক মজার ঘটনা।
কথা বার্তা ও খাবার-দাবার এ তিনি ঢাকার ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে ছিলেন। তাঁর মুখ হতে উচ্চারিত ঢাকাইয়া বুলি অনেক আধুনিক মনে হত।তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ, জ্ঞানের সেবা। নিজে যেমন জ্ঞান অর্জন করতেন তেমনি অন্যকেও অনুপ্রেরণা দিতেন জ্ঞান সাধনায় ব্রত হওয়ার প্রতি।আহমদ ছফার মতে, ‘প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের মত আমাকে অন্য কোনো জীবিত বা মৃত মানুষ এত প্রভাবিত করতে পারেনি’। রাজ্জাক সাহেব তাকে প্রচুর বই পড়তে বলতেন। নোট রাখতে বলতেন। প্রয়োজনে ধমক দিতেন।জার্মান কবি গ্যোতের ‘ফাউস্ট’ এর অনুবাদ করাকে নিজের একটা বড় কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আহমদ ছফা। একই সাথে এই কাজের প্রধান অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে নাম নিয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক স্যারের।
জ্ঞানের সেবা করতেই রাজ্জাক সাহেব চিরকুমার থেকে গেছেন। তাঁর বিশাল লাইব্রেরির পুরাতন বইয়ের সুমিষ্ট সুবাস আহমদ ছফাকে আকৃষ্ট করতো। সেখানে ছিল দেশি বিদেশি নানা বই। রাজনীতি, অর্থনীতি, পৌরনীতি, সাহিত্য, ডিকশনারি সব রকমের বই।বইটিতে প্রফেসর সাহেবের ধর্মীয় গবেষণার কিছু দিকও প্রকাশ পেয়েছে। জন্মান্তরবাদ এর ছিটেফোঁটাও বেদে নেই। এটা হিন্দু সমাজ দ্রাবিড়দের কাছ থেকে ধার করে একটা প্রথা হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছে।বাইবেল মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে অনেক কথা বললেও ইসলামের মত পার্থিব জীবন নিয়ে তেমন কিছু বলেনি।যেখানে ‘ইসলাম ফিদ্দুনিয়া ওয়াল আখেরাত’ এর কথা বলে দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে একটা ভারসাম্যমূলক বক্তব্য দিয়েছে।এই বইটিতে কাজী মোতাহের হোসেন, শেখ মুজিব প্রমুখ ব্যক্তিদের নিয়ে কথা হয়েছে গুরু শিষ্যের মধ্যে।পাঠকদের পরিচয় করে দেয়া হয়েছে অনেক বইয়ের সাথে।শেষ করব, ‘যদ্যপি আমার গুরু’র দুটো লাইন দিয়ে, “আমি বললাম, বাংলার ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু বলেন। স্যার বললেন, বাংলার ভবিষ্যত সম্পর্কে আমি আর কি কমু। সে তো আপনাগো উপর।”

বই রিভিউ: হাজার বছর ধরে।

হাজার বছর ধরে উপন্যাস গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন এর সাথে মিলে যায় যেটা পড়লে মনে হয় যে আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো উপন্যাসের সঙ্গে মিলে যায়। আমি উপন্যাসটা প্রথম পড়েছিলাম ক্লাস সেভেনে, অনেক আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলাম। হাজার বছর ধরে উপন্যাস পড়ে আমার উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ জাগে।

মকবুলের ছোট বউ টুনি উপন্যাসে বোধকরি সবচে’ সক্রিয় নারীচরিত্র। তাকে ঘিরে উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয় বলা যায়। টুনি বয়সে কিশোরী। বয়সের সাথে মানানসই চপলচিত্ত তাকে মন্তুর সাথে গভীর রাতে শেখদের পুকুরে মাছ ধরতে কিংবা ধলপহরে পরীর দিঘিতে শাপলা তুলতে যেতে প্ররোচিত করে। প্ররোচিত করে নিজের বাপের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া মন্তুকে শেষ রাতে ঘুম থেকে তুলে কলসি নিয়ে খেজুরের রস চুরি করতে যাওয়ার সাহস দেখাতে। আত্মত্যাগে কলসির ব্যবহার প্রসঙ্গটা এখানেই আসে। টুনি মজার ছলে মন্তুকে একথা বললেও বুদ্ধিমান পাঠক এই মনস্তত্ত্বটা বুঝবেন বলেই মনে করি।

বঙ্কিম-সাহিত্যেও এ মনস্তত্ত্বের দেখা মেলে। প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন আমল থেকেই এই চর্চা ছিল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, পুরনো বাঙলা লোকগানেও এর প্রমাণ মেলে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক বাঙলা ভাষায় এ রূপকল্পের প্রয়োগ বেশি হয়।
উপন্যাসে অঙ্কিত গ্রামের মানুষগুলোর সকলের ধর্ম ইসলাম। সকলেই ধর্মকর্মে অতটা উৎসাহী না হলেও জীবনাচরণের দিক থেকে ধর্ম মেনে চলতেই তাদের দেখা যায়। তাবিজ-কবচ, জিন-ভূতে এন্তার বিশ্বাস তাদের। বিশ্বাস অবৈজ্ঞানিক ঝাড়ফুঁকেও। সকল ধর্মেই নারী-পুরুষে নিষিদ্ধতার বিষয়টা আছে। এটা এরা খুব মেনে চলে। ধর্মঘেঁষা কুসংস্কারও এদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ওলাবিবি প্রসঙ্গে ভয়-সমীহের মিশেলের কুসংস্কার তো রয়েছেই।
উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ, ঘটনাস্থল, বিস্তার, ভাষাতত্ত্ব বিবেচনায় শুধু সামাজিক উপন্যাস বলে দেয়া যায় না। এখানে মোটাদাগে ত্রিভূজ প্রেম দেখানো হয়েছে। হীরনের বিয়ের জটলায় ঘটনার আকস্মিকতায় সামাজিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে ত্রিভুজ প্রেমের গল্পও বেরিয়ে আসে, যেখানে টুনি মন্তুকে পেতে চায়, আবার আম্বিয়া মন্তুর ঘরের দরজা দিয়ে মন্তুর প্রতি টানের অপ্রকাশ্য প্রকাশ ঘটায়। একটা ঠাট্টার প্রতিক্রিয়ায় টুনি মারতে আসে সালেহাকে। আবার মন্তুর নির্বিকার চরিত্রের মধ্যে রহস্য খুঁজতে গেলে এখানে মনস্তাত্ত্বিক গল্পের আভাস মেলে।



মুভি রিভিউ: স্পটলাইট

স্পটলাইট  ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটিতে ফুটে উঠেছে গোপন কিছু রহস্য বেদ করে সত্য উদঘাটন করেছে একটি সাংবাদিক  টিম তার নাম স্পটলাইট।  যাজকদের নির্যাতনের শিকার শিশুদের করুন কাহিনী তো ফুটে উঠেছে মুভিটিতে। মুভিটিতে প্রথমে যে  দৃশ্যটা দেখানো হয়েছে অনেক কিছু বুঝায়। কাহিনীর পরীক্রমায়  হয়ে গিয়ে যায় মুভিটি….

চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন টম ম্যাকার্থি। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন মার্ক রাফালো, মাইকেল কিটন, র‍্যাচেল ম্যাকঅ্যাডাম্‌স, লিভ স্ক্রাইবার, প্রমূখ। ৮৮তম একাডেমি পুরস্কার আসরের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র স্পটলাইট ।
যুক্তরাষ্ট্রে বোস্টনের ম্যাসাচুয়েটসে শিশুদের ওপর গির্জার ক্যাথলিক পুরোহিতের নির্যাতনের ঘটনা অনুসন্ধান করে দ্য বোস্টন গ্লোব পত্রিকার প্রতিবেদকরা। তাদেরকে বলা হয় স্পটলাইট টিম। ২০০৩ সালে নিজেদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিৎজার পুরস্কার জেতেন তারা। সেই সত্যি ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘স্পটলাইট’।
প্রতিটা দেশ, সমাজেই কিছু স্পর্শকাতর বিষয় থাকে, প্রদীপের নিচে অন্ধকার থাকে যা কেউই সামনে নিয়ে আসতে চান না। সাহস করে কেউ এগিয়ে এসে ভদ্রতা এবং সভ্যতার চাঁদর ওঠালেই নিচে দেখা যায় পচনের মাত্রা, কোন পর্যন্ত তা পৌছে গেছে তা ভেবে অবাক হতে হয়।

২০০২ সালে বিখ্যাত মার্কিন পত্রিকা বোস্টন গ্লোব পত্রিকায় নতুন সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেই সাংবাদিক মার্টি ব্যারন একটি পুরনো কলাম খুঁজে পান, যেখানে একজন আইনজীবির বরাত দিয়ে চার্চের একজন যাজকের ওপর শিশু নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়। তার অনুরোধে পত্রিকাটির বিখ্যাত ইনভেস্টিগেটিভ টিম ‘স্পটলাইট’ কাজ শুরু করে ক্যাথলিক চার্চের কিছু যাজকদের যৌন নিপীড়ন নিয়ে, যার ভিকটিমদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল শিশু (ছেলে এবং মেয়ে)। সাংবাদিকেরা তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য; একজন যাজক সম্পর্কে জানতে গিয়ে বেরিয়ে আসে ১৩ জন যাজকের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা, এবং ঘটনাপ্রবাহের আলোকে এবং নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক দল এবং ঐ আইনজীবির প্রচেষ্টায় বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ চিত্র, পুরো চার্চ ব্যবস্থাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রেই শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের চিত্র খুঁজে পান তারা।

২০০৩ সালে এ ধরনের প্রায় ৬০০টি ঘটনার রিপোর্ট আসার পর একপর্যায়ে বোস্টনের ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনাল স্বয়ং পদত্যাগ করেন, অসংখ্য শিশু রক্ষা পায় শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের হাত থেকে। ২০১৫ সালের অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতা মুভি ‘স্পটলাইট’ জীবন্তভাবে তুলে এনেছে সত্যিকার এই ঘটনাটিকে, তারকা সম্বলিত এনসেম্বল কাস্টের অসাধারণ অভিনয় এবং রুদ্ধশ্বাস ঘটনাপ্রবাহের আলোকে আপনি নিজেকেও স্পটলাইট টিমের একজন সদস্য ভাবতে পারেন। কোন ধরনের অ্যাকশন ছাড়া স্রেফ কাহিনী এবং সংলাপনির্ভর এই মুভিটি পুরো রানটাইমের ২ ঘন্টা ৬ মিনিট সময় আপনাকে টেনে ধরে রাখবে।

সিনেমায় যে ইস্যুটির উপর ফোকাস করা হয়েছে তা খুবই সেনসেটিভ ইস্যু, এ কারণেই খুবই সতর্কভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন স্পটলাইট টিম, এবং এখানে মুভির পরিচালক টম ম্যাকার্থি। একে তো শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, তার সাথে আছে অবাক করা সংখ্যক ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের নাম। স্পটলাইট টিম একপজন ইনসাইডারের কাছ থেকে কিছু গোপন তথ্য লাভ করেন, যা বলছে যে সমগ্র বিশ্বের চার্চের যাজকদের মধ্যে অন্তত ৬% সদস্য এইধরণের অপরাধের সাথে জড়িত। এর সাথে সাংবাদিক এবং আইনিজীবির মানবিক দিকগুলো, এইধরনের ঘটনা এবং ভিকটিমদের সাথে কথা বলবার বিষয়টিকে টম ম্যাককার্থি জীবন্তভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
মুভিটিতে যে বিষয়টি আমাকে আলোড়িত করে, তা হলো সত্যিকারের অনুসন্ধিৎসা এবং সমাজের ক্ষত সারানোর জন্য কিভাবে কার্যকর ভূমিকা নিতে হয়, তা তুলে আনবার এক অনবদ্য প্রচেষ্টা। শিশু নির্যাতনের কিছু অভিযোগ একেবারে ষাটের দশক থেকে গুঞ্জণে সীমাবদ্ধ ছিল, আর বছরের পর বছর সব জেনেও ক্যাথলিক চার্চ ব্যাপারটাকে কৌশলে ধামাচাপা দিয়ে গিয়েছে। পুরো সিস্টেমের বিরুদ্ধেই দাঁড়ানোর মত সাহস এবং কৌশল যেভাবে সাংবাদিকেরা নিয়েছিলেন, তা সত্যিই অসাধারণ। আর এই সামগ্রিক কাজের জন্যেই ২০০৩ সালে বোস্টন গ্লোব পত্রিকার এই স্পটলাইট দল পুলিৎজার পুরষ্কার লাভ করেছিলেন।